সুস্থ দেহে সুন্দর মন : সুস্থ থাকতে আমাদের যা জানা প্রয়োজন

প্রবাদ আছে – Sound mind lives in a sound body। শরীর ও মন অবিচ্ছেদ্য অংশ। শরীর ভাল থাকলে মন ভাল থাকে আর মন ভাল থাকলে পৃথিবী রঙিন লাগে, সব কাজই ভাল লাগে। তাহলে এই শরীর কে কিভাবে সুস্থ রাখা যায়? ভাল ভাল খাবার খেয়ে? নামী দামী পোশাক পরে ? ঔষধ সেবনে? সহজ কথায় উত্তর আসে না। আসুন জেনে নিই, সুস্থ দেহে সুন্দর মন পাওয়ার উপায় সমূহ :

শুধু ভাল খাবার বা ঔষধ দেহকে সবসময় সুস্থ রাখতে পারে না। খাদ্য গ্রহণের সাথে চায় কায়িক শ্রম। একটি মেশিনের সাথে মানব দেহকে তুলনা করা যায়। মেশিন যেমন বন্ধ থাকলে এবং নিয়মিত তেল না দিলে বিকল হয়ে পরে, তেমনি কায়িক শ্রম ছাড়া দেহকে সুস্থ রাখা যায় না। কায়িক শ্রমের একটি মাধ্যম হল ব্যায়াম ও খেলাধুলা।

ব্যায়াম খেলাধুলা ইত্যাদি ক্রিয়াকলাপের মধ্য দিয়ে দেহের মাংসপেশী সমূহ সতেজ ও শক্তিশালী হয়ে উঠে। সেই সাথে হৃদপিন্ড,ফুসফুস,খাদ্যনালী প্রভৃতি গুরুত্বপূর্ণ তন্ত্র সমূহের কার্যক্ষমতা বাড়ে। ফলে দৈহিক ও মানসিক সুস্থতায় একজনের দৈহিক কর্মস্পৃহা ও বৃদ্ধি পায় এব দেহ ও মনের সামঞ্জস্যপূর্ণ সর্বাঙ্গীন উন্নয়ন সাধন করে। একটি শিশু ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর যখন তার হাত পা সঞ্চালন করে তখন তার মাংশপেশীগুলো সক্রিয় হয়, ব্যায়াম এর কাজ করে। এ থেকে বোঝা যায় জন্ম থেকে জীবনের শেষ পর্যন্ত ব্যায়ামের গুরুত্ব অপরিসীম।

মানুষ যখন কায়িক শ্রম বা ব্যায়াম ছেড়ে দেয় তখন তার মাংশপেশী ও দেহের গুরুত্বপূর্ণ তন্ত্রগুলো নিস্ক্রিয় হয়ে যায়। ফলে দেহের মধ্যে জড়তা সৃষ্টি হয়। দেহে মেদের পরিমান বেড়ে যায়। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায় এবং বিভিন্ন রোগ এসে দেহে বাসা বাঁধে। ফলে দেহ হয় অসুস্থ। এই অসুস্থ দেহের সাথে সুস্থ মনের বনিবনা হয় না। সুস্থ মন দেহ থেকে বিদায় নেয় আর অসুস্থমন দেহে আসন গেড়ে বসে। এই অসুস্থ মনে কোন কিছু সুস্থ ভাবে ভাবা যায় না। টাকা-পয়সা,ধনদৌলত,স্ত্রী-পুত্র-কন্যা,স্নেহ,প্রেমপ্রীতি, ভালবাসা,কোনটাই ভাল লাগে না। তখন পৃথিবী হয়ে উঠে বিষাদময়।

সুস্থ দেহে সুন্দর মন পেতে করণীয় কি?

দেহকে সুস্থ রাখার জন্য আমাদের দৈনিক নূন্যতম ৪০ মিনিট ব্যায়াম করা প্রয়োজন। সুস্হতার জন্য ব্যায়ামের বিকল্প নেই। সাথে প্রয়োজন পরিমিত খাবার ও পরিমিত বিশ্রাম ও নিদ্রার। শরীর ও মনকে বিশ্রাম দেওয়ার জন্য নিদ্রার একান্ত প্রয়োজন।

দৈনন্দিন জীবনে পরিশ্রমের ফলে শরীরে যে স্নায়ুবিক শক্তি ব্যয় ও ক্ষয় ক্ষতি হয় তাতে শরীরের কার্যক্ষমতা হ্রাস পায়। শরীরের কোষ সমূহ ক্লান্ত হয়ে পড়ে। ফলে অবসাদ দেখা দেয়। এ ক্ষয় পূরণের এবং কর্মদ্যোম পূণর্জীবিত করার জন্য পূর্ণ বিশ্রামের প্রয়োজন। পরিশ্রমের পর বিশ্রাম করলে ক্ষয়প্রাপ্ত জীব কোষগুলো পূর্বাবস্থায় ফিরে আসার সুযোগ পায়। বিশ্রামে শারীরিক ক্লান্তি ও মানসিক অবসাদ বিদূরিত হয়।

খাওয়ার পরই পরিশ্রম করা উচিত নয়। কারণ এ সময় আমাদের দেহের তন্ত্রগুলো পরিপাক ক্রিয়ায় ব্যস্ত থাকে। নিদ্রা কালে আমাদের শরীর ও মন বিশ্রাম পায়। প্রকৃত পক্ষে নিদ্রা আমাদের মস্তিষ্ককে বিশ্রাম দেয়। তবু ও মস্তিষ্কের কিছু অংশ কর্মরত থাকে বলে আমরা স্বপ্ন দেখি। যদি স্বপ্নবিহীন নিদ্রা হয় তাহলে বুঝতে হবে মস্তিষ্ক পূর্ণ বিশ্রাম লাভ করেছে। কিন্তু মেরুরজ্জু এবং স্বয়ং সচল তন্ত্রগুলো নিদ্রার মধ্যে ও কাজ করে। মস্তিষ্কের ক্ষয়পূরণের জন্য নিদ্রার প্রয়োজন হয়। এ সময় দেহতন্ত্রের জীব কোষগুলোর পূণর্গঠন ও বৃদ্ধি সাধন হয়ে থাকে।

বিভিন্ন বয়সের লোকের দৈনিক ঘুমের পরিমাণ –

১. সদ্যজাত শিশুর – ১৮ থেকে ২০ ঘন্টা ঘুমের প্রয়োজন।
২. দুই বছরের ছেলেমেয়েদের – প্রায় ১৪ ঘন্টা ঘুমের প্রয়োজন।
৩. ৫-৭ বছরের ছেলেমেয়েদের – প্রায় ১০/১১ ঘন্টা ঘুমের প্রয়োজন।
৪. ৮-১১ বছরের ছেলেমেয়েদের – প্রায় ৯/১০ ঘন্টা ঘুমের প্রয়োজন।
৫. ১২-১৪ বছরের ছেলেমেয়েদের – প্রায় ৮/৯ ঘন্টা ঘুমের প্রয়োজন।
৬. পূর্ণ বয়স্কদের – প্রায় ৬/৮ ঘন্টা ঘুমের প্রয়োজন।
৭. পঞ্চাশ উর্ধ্ব বয়স্কদের প্রায় ১০ ঘন্টা ঘুমের প্রয়োজন হয়।

পরিমিত বিশ্রাম ও ঘুম যেমন শরীরের পক্ষে উপকারী তেমনি অতিরিক্ত বিশ্রাম ও ঘুম স্বাস্থ্যের জন্য খুবই ক্ষতিকর। অধিক নিদ্রায় এতে শরীর অলস হয়ে পড়ে। কাজ কর্মে উৎসাহ পাওয়া যায় না। হাত,পা ও শরীরে ব্যথা অনুভূত হয়। এমনকি সন্ধিস্থলে এক প্রকার রস জমে ব্যথার সৃষ্টি করে। বেশি বিশ্রাম নিলে ক্ষুধা কম লাগে এবং কোনও কাজে মন বসে না।

বিশ্রামের সময় শরীরের হজম ক্রিয়া ধীরে হয়।ফলে দেহের অক্সিজেন খরচ কম হয় অর্থাৎ টিস্যুগুলোতে কম অক্সিজেন যায় এবং কার্বনডাইঅক্সাইড নির্গত হয়। তখন থেকে ক্ষুধা মন্দাভাব শুরু হয়। বদ হজম ও অর্জীন সৃষ্টি হয়। এ থেকে বিভিন্ন রকমের অসুখ দেখা দেয়। ফলে দেহ ও মন হয়ে উঠে অসুস্থ। তাই সুস্থ দেহে সুন্দর মন সৃষ্টির জন্য নিয়মিত কায়িক পরিশ্রম, ব্যয়াম ও খেলাধুলার যেমন প্রয়োজন তেমনি প্রয়োজন পরিমিত খাবার,বিশ্রাম ও ঘুমের।

Leave a Comment

4 × five =