বাংলা-নামে-দেশ-বাংলাদেশ

বাংলা নামের ইতিহাসঃ বাংলা নামে দেশ এলো যেখান থেকে

ভারত উপমহাদেশের পূর্ব প্রান্তে একসময় বাংলা নামে একটি দেশ ছিল, যার নাম ছিল বঙ্গ বা বঙ্গদেশ। কোথাও কোথাও বলা হত শুধু বঙ্গ। পরবর্তীতে এই বঙ্গদেশ এর নাম হলো বাংলাদেশ। এই দেশটির মানুষদের বলা হত বাঙ্গাল। আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের কলকাতা বা পশ্চিমবঙ্গ প্রদেশে গেলে তখন বাংলাদেশ বা পূর্ববাংলা থেকে এসেছে শুনলে তখনকার লোকেরা ঠাট্টা করে জিজ্ঞেস করে বাঙ্গাল কিনা? কলকাতায় যখন কোন দলের সাথে ইষ্টবেঙ্গল ক্লাবের খেলা হয়, তখনও বলা হয় আজ অমুক দলের সাথে বাঙ্গালদের খেলা। ইষ্ট বেঙ্গল মানে হচ্ছে পূর্ববাংলা। অনেক আগে এপার বাংলা থেকে যারা ওপার বাংলায় গিয়েছিল তারাই ইষ্টবেঙ্গল ক্লাব গড়ে তুলেছিল।

কলকাতার বিখ্যাত কৌতুক অভিনেতা ভানু বন্ধ্যেপাধ্যয়। তিনি ছিলেন পূর্ববাংলারই লােক। তাকে অনেকেই বাঙ্গাল বলে ক্ষেপাত। তখন তিনি পাল্টা প্রশ্ন করতেন আমি বাঙ্গাল হলে তুমি কি? তখন তারা বলত আমি বাঙ্গালী। ভানু বন্ধ্যেপাধ্যায় বলতেন তাহলে ব্যাকরণ কি বলে? আমি পুঃলিঙ্গ আর তুমি হচ্ছ স্ত্রী লিঙ্গ। বাঙ্গাল আর বাঙ্গালী। এই যে বাংলাদেশ, যা আগে পূর্ববাংলা ছিল। এই অঞ্চলের মানুষকে অন্যেরা বাঙ্গাল বলে ঠাট্টা করুক আর যাই করুক, এই বলে ডাকার খুবই যুক্তিসংগত কারন রয়েছে। কারন এই পূ্র্ববাংলার লোকেরাই আসল বাঙ্গালী। ফলে তারা বাঙ্গাল’ই । কিছুটা বােধ রয়েছে হয় কাঙালও। এই পূর্ববাংলার আসল বাঙ্গালীর রহস্য ভেদ করার আগে আমরা বাংলা নামটি কোথা থেকে এল তার ইতিহাসটিও জেনে নিই।

বাংলা নামে দেশ যেভাবে হলো

বিখ্যাত মহাকাব্য মহাভারতে একটি গল্প আছে। গল্পটি হল, বলি রাজা নামে একজন রাজা ছিলেন। তিনি ছিলেন নিঃসন্তান। তাঁর রানী সুদেষ্ণাকে বর দিয়েছিলেন এই বলে যে, তাঁর ছেলেদের নামে বিভিন্ন রাজ্যের নাম হবে। গল্পে আছে সেই থেকে রানী সুদেষ্ণার পাঁচ ছেলের নামে পাঁচটি রাজ্যের নাম হয়। অঙ্গের নামে অঙ্গদেশ, কলিঙ্গের নামে লিঙ্গদেশ, পুন্ড্রের নামে পুন্ড্রদেশ, সুরের নামে সুদেশ এবং বঙ্গের নামে আমাদের এই বঙ্গদেশ। গল্পটি কতটা সত্য তা নাইবা জানলাম, তবে এই পাঁচ নামের পাঁচটি জনপদ প্রাচীন যুগে ছিল।

বাংলা-নামে-দেশ
pixabay/nazrulkhan88

প্রাচীন ও মধ্যযুগ থেকে শুরু করে এই আধুনিক যুগ পর্যন্ত এই বঙ্গদেশ বা বাংলা নামে দেশ তথা বাংলাদেশ বিভিন্ন ভাগে বিভক্ত ছিল। একেক গােষ্ঠীকে প্রাচীনকালে বলা হত কোম এবং এই কোমগুলির নামে জনপদের নাম পরিচিত হয়েছিল। এই রকম অনেক জনপদ ছিল। বঙ্গ, গৌড়, রাঢ়, পুন্ড্র ইত্যাদি আলাদা আলাদা রাষ্ট্র ছিল। বরিশাল থেকে সিলেট জনপদপকে বলা হত হরিকেল। এটির আরেক নাম ছিল চন্দ্রদ্বীপ। এক সময় পুরো বাংলাকে বলা হত সমতট জনপদ। বগুড়া,রাজশাহী ও দিনাজপুর অঞ্চল মিলে ছিল পুন্ড্রবর্ধন জনপদ। এই অঞ্চল বরেন্দ্র জনপদ নামেও পরিচিত ছিল। বর্ধমান,হুগলি,হাওড়া ইত্যাদি মিলে ছিলো রাঢ় জনপদ। গৌড় নামেও একটি জনপদ ছিল। এক সময় সমগ্র বাংলাদেশকে বলা হত গৌড়। এভাবে সমতটের উপর গৌড়,পরে গৌড়ের উপর বঙ্গ নাম আধিপত্য বিস্তার করে। তবে একটা প্রশ্ন কিন্তু থেকে যায়, মূল বঙ্গ শব্দ থেকে বাঙ্গাল শব্দ হলো কিভাবে? পন্ডিতরা এর একটি ব্যাখ্যা দিয়ছেন।

সম্রাট আকবরের রাজ সভার পন্ডিত আবুল ফজল বলেছেন, বাংলাদেশে আজকের মতো আগেও ঝড়-বৃষ্টি,বন্যা লেগেই থাকত। ফলে সুবিধা মতো জায়গায় বাঁধ দেওয়া হতো। এই বাঁধের আরেক নাম হচ্ছে আল। আজও গ্রামে গেলে সেখানে আল শব্দটা শুনতে পাওয়া যায়। এখানে কৃষি জমিতে আল থাকে। দুটো জমির মাঝখানের সীমানাকে আল বলা হয়। গােটা বাংলাদেশ জুড়েই আমরা এই আলের দেখা পাবো। মনে করা হয়, বঙ্গ শব্দের সাথে এই আল যুক্ত হয়ে বঙ্গ + আল = বঙ্গাল হয়। তার থেকে আস্তে আস্তে বাঙ্গাল, তারপর বাঙ্গালা ও বাংলা শব্দের উৎপত্তি হয়েছে।

“বাংলা” শব্দের উৎপত্তি হয়েছে সংস্কৃত শব্দ “বঙ্গ” থেকে। ইতিহাস থেকে জানা যায় আর্যরা “বঙ্গ” বলে এই অঞ্চলকে অভিহিত করতো।  ব্যাকরণের ভাষায় বলতে হলে বিষয়টি বােঝাতে হবে এমন করে : (বঙ্গ + আল = বঙ্গাল> বাঙ্গাল> বাঙ্গালা> বাঙলা > বাংলা)।  বাংলা নামের এলাকাগুলি এবং গঠনের বিষয় যতই হিজিবিজি মনে হােক না কেন, আমাদের ইতিহাস জানার জন্য এগুলাে বারবার পড়ার প্রয়ােজন আছে।

৬০০ সালে বঙ্গদেশে প্রথম স্বাধীন রাজ্যে চালু হয়েছিল। কেউ কেউ মনে করেন এর আগে থেকে বাংলাদেশে রাষ্ট্র ব্যবস্থা চালু ছিল। ৭০০ সালে রাজা শশাঙ্ক প্রাচীন বাংলার সকল এলাকা ও জনপদকে এক করার চেষ্টা করেন। পাল রাজারা এবং সেন রাজারাও একই চেষ্টা করতে থাকেন। বাংলার ইতিহাসে পাল রাজাদের মত সেন বংশের রাজারাও দীর্ঘদিন এদেশ শাসন করেছেন। তবে পশ্চিম থেকে এসে পাঠানরা সর্বপ্রথম বঙ্গ নাম বাদ দিয়ে বাংলার সকল জনপদ ঐক্যবদ্ধ করেন। সম্রাট আকবরের আমলে এই দেশটির নাম হয় সুবা বাংলা। পরে ইংরেজরা যখন এই দেশ দখল করে নিল তখন তারা দেশটির নাম দিল বেঙ্গল।

১৯৪৭ সালে আমাদের এই উপমহাদেশটি দুটি ভাগে ভাগ হয়ে যায়। একটির নাম হয় ভারত অপরটির নাম হয় পাকিস্তান। এই সময় আরাে একটি ভাগ হওয়ার কথা ছিল বঙ্গদেশ বা বাংলাদেশ নামে। কিন্তু ষড়যন্ত্রের কারণে বাঙ্গালীরা হেরে যায়। শুধু হেরে গেল না, বাঙ্গালীদের জন্মভূমি বাংলাদেশ দুটো টুকরাে হয়ে গেল। একভাগ পশ্চিমবঙ্গ, ভারতের সাথে যুক্ত করা হল অপরভাগ পূর্ববঙ্গ নাম দিয়ে পাকিস্তানের সাথে সাঁকো লাগিয়ে বেধে দেওয়া হল। সাঁকো লাগানাের কথা বলতে হলো এ কারনে যে, পূর্ববঙ্গ ও পাকিস্তানের অন্য অংশের মধ্যে দূরত্ব ছিল এক হাজারেরও বেশী মাইল। দুনিয়ায় এর আগে এমন কোন অদ্ভুদ দেশ তৈরী হয়নি। এটি ছিল অবশ্য ব্রিটিশদের কুট কৌশলের কারণে।এ কারণে এখনাে কেউ যখন খুব শয়তানি কাজ কারবার করে আমরা তাকে ব্রিটিশ বলে সম্বােধন করি। যাই হােক এই অবস্থায় আমাদের দেশটির নাম আবার পরিবর্তন করা হল। বলা হল এর নাম, পূর্ববঙ্গ নয় পূর্ব পাকিস্তান।

বি:দ্র : বিভিন্ন পত্রিকা ও ম্যাগাজিন এর বাংলার ইতিহাস বিষয়ক লেখা থেকে তথ্য সংগ্রহ করে এই পোস্টটি লেখা হয়েছে।

Leave a Comment

17 + seven =