বাংলাদেশের নদ নদীর

বাংলাদেশের নদ নদীর নামকরণের ইতিহাস

বাংলাদেশ হলো নদীর দেশ বা নদীমাতৃক দেশ। এ দেশের আনাচে কানাচে অসংখ্য নদ নদী জালের মত ছড়িয়ে আছে। আমাদের এই বাংলাদেশকে অপরূপ সৌন্দর্য্যে সৌন্দর্য মন্ডিত করার পিছনে নদ-নদী গুলো মূখ্য ভূমিকা পালন করছে।

বাংলাদেশে বহু সংখ্যক নদ-নদী রয়েছে, যে গুলি প্রবাহিত হয়েছে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল দিয়ে। বাংলাদেশের প্রধান নদ-নদী গুলির মধ্যে পদ্মা, মেঘনা, যমুনা ও ব্রহ্মপুত্র উল্লেখযোগ্য। এই প্রধান নদ- নদীগুলি ছাড়াও কর্ণফুলী, কপোতাক্ষ, তিতাস, গোমতী, শীতলক্ষ্যা বাংলাদেশের অন্যতম নদ-নদী।

দেশের প্রধান নদ-নদীগুলো সম্পর্কে আমরা সবাই কম বেশি জানি। কিন্তু এই সকল নদ-নদীর নামকরণ বা এগুলোর নাম কিভাবে আসলো তা কি আমরা সবাই জানি? চলুন তাহলে জেনে নিই বাংলাদেশের প্রধান কিছু নদ-নদীর নামকরণের ইতিহাস –

বাংলাদেশের নদ নদীর নামরহস্য

পদ্মা : পদ্মা নদীর প্রাচীন নাম ‘নলিনী’। পদ্মা নদীর নামের উৎপত্তি প্রসঙ্গে রামায়ণে নলা হয়েছে যে, গঙ্গা নদীর এই পৃথিবীতে আসার ক্ষেত্রে কিছু শর্ত দেয়া হয়েছিল। এই শর্তগুলো পালনে ব্যর্থ হওয়ায় পদ্মাবতী গঙ্গা দেবীকে ভুলপথ পূর্বদিকে নিয়ে যান। সম্ভবত মায়াজাল বিস্তারকারী এই পদ্মাবতীর নামানুসারেই এ নদীর নাম রাখা হয় ‘পদ্মা’।

মেঘনা : মেঘনা অর্থাৎ মেঘ দেখলে নৌকা ছেড়ো না,এমন একটা ধারণা থেকেই মেঘনা নামটির উৎপত্তি। এ নদীতে নৌ চালনা খুব বিপদজনক। এমনিভাবে মেঘ এবং না দুটি বিচ্ছিন্ন শব্দকেন একীভূত করে নদীর নাম রাখা হয়েছে মেঘনা।

যমুনা : পুরাণ থেকে জানা যায়, বিশ্বকর্মার মেয়ের নাম ছিল ‘সংজ্ঞা’। কেউ তাকে সুরেণু ঊষা বলেও ডাকতো। সংজ্ঞার মনু, যম ও যমুনা নামে তিনটি সন্তান ছিল। পুরাণের সেই যম, যমুনা হতেই যমুনা নামটি এসেছে।

বুড়িগঙ্গা : গঙ্গার একটি ধারা প্রাচীনকালে ধলেশ্বরী দ্বারা প্রবাহিত হয়ে বঙ্গোপসাগরে গিয়ে পড়ত। পরবর্তীকালে গঙ্গার এই ধারা তার গতিপথ পরিবর্তন করে। ফলে গঙ্গার সাথে এ নদীর সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। কিন্তু প্রাচীন গঙ্গা এই পথে প্রবাহিত হতো বলে এর নাম হয়েছে বুড়িগঙ্গা।

তিস্তা : তিস্তা শব্দটি সংস্কৃত ‘ত্রিস্রোতা’ শব্দ থেকে এসেছে। পুনর্ভবা,করতোয়া ও আত্রাই এই তিনটি হলো তিস্তার তিনটি শাখা বা ত্রি-স্রোত। ১৭৮৭ সালে তিস্তা নদীতে ভয়াবহ বন্যা হয় এবং তিস্তা ত্রিস্রোত গতি বদলে বর্তমান রূপ ধারণ করে। তিস্তা নদী সম্পর্কে ‘কালিকা পুরাণে’ বলা হয়েছে পার্বতীর বুক থেকে তিনটি ধারা বের হয়ে ত্রিস্রোতা বা তিস্তার জন্ম।

তিতাস : তিতাস শব্দটি সংস্কৃত। তিরাস বা তিতা শ্বাস থেকেই তিতাস শব্দের উৎপত্তি। তিক্ত > তিত্ত > তীতা > তিতা + শ্বাস > সো আসা > আস = তিতা + আস = তিতাস > তিক্ত শ্বাস। কারো মতে, তিয়াস (তৃষা শব্দের কোমল রূপ) কিংবা আঞ্চলিক তিরাস (পিপাসা) থেকেই তিতাস নামটি এসেছে।

কপোতাক্ষ নদ : কপোত + অক্ষ = কপোতাক্ষ। কপোত অর্থ পাখি। আর অক্ষ অর্থ চোখ। কপোতাক্ষ নদের পানি খুবই স্বচ্ছ। তাই এর নামকরণ হয়েছে কপোতাক্ষ নদ।

কুশিয়ারা : সংস্কৃত কোশ বা কোষ থেকে বাংলা ভাষায় ‘কুশি’ শব্দটি এসেছে। কোশ হচ্ছে কোষ (ছোট নৌকা) থেকে পানি তোলার পাত্র। এই কোশ-ই কালের বির্বতনে ‘কুশিয়ারা’ নাম ধারণ করে।

কর্ণফুলী : কর্ণফুলী নদী নামকরণের একটি লোককাহিনী প্রচলিত আছে। তা হলো, একদা একটি নৌকায় একই সাথে যাত্রী হয়ে একজন ইংরেজ ভদ্রলোক এবং একটি কিশোরী এই নদী পথে কোথাও ঘুরতে বেড়িয়েছিল। মেয়েটি নৌকায় বসে কাঁদছিল। ইংরেজ সাহেব তার কান্নার কারণ জানতে চাইলে মেয়েটি ইশারায় ইঙ্গিতে বোঝালো যে, তাঁর কর্ণ অর্থাৎ কানের ফুল নদীতে হারিয়ে গেছে। সেই কর্ণফুল বা কানের ফুল থেকেই কর্ণফুলী নামের উৎপত্তি। কর্ণফুলীকে মারমারা ‘কিনসা খিয়াং’ বলে। খিয়াং অর্থ নদী। স্থানীয় বয়োজ্যেষ্ঠরা বলে কাইচা খাল।

করতোয়া : কথিত আছে, হিন্দু দেবতা শিব যখন পর্বত কন্যা পার্বতীকে বিয়ে করেন, তখন বিয়ের অনুষ্ঠানে শিবের করে (হাতে) যে ‘তোওয়া’ (জল) ঢালা হয়, সেই জলের (তোওয়া) নিঃসৃত হয়ে করতোওয়া (করতোয়া) নদীর সৃষ্টি হয়। করতোয়া হল যমুনার প্রধান উপনদী।

কীর্তিনাশা : পদ্মা নদীর আরেক প্রবাহের নাম কীর্তিনাশা। ধারণা করা হয়, দুর্দান্ত রাজা রাজবল্লভের কীর্তি ধ্বংসকারী বলেই এর নাম রাখা হয়েছে কীর্তিনাশা। অর্থাৎ কীর্তি নাশ (ধ্বংস) করে যে।

আড়িয়াল খাঁ : ঊনবিংশ শতাব্দীতে আড়িয়াল খাঁ নদীর পূর্ব নাম ছিল আনদাল খাঁ। সম্ভবত এই আনদাল খাঁ থেকেই আড়িয়াল খাঁ নামটির উৎপত্তি।

গোমতি : গোমতি নাম, কাম > কোমতুই > কোমাতি > কোমতি > গোমতি এমনি বিবর্তনের ধারায় বর্তমান রূপ লাভ করেছে। প্রচলিত আছে, গো-মূত্র থেকেই নাকি গোমতি নামের উদ্ভব। একসময় কুমিল্লার দুঃখ বলা হতো এই গোমতি নদীকে।

দুধকুমার : দুধকুমার নদীর উৎপত্তি ভারতের সিকিম থেকে। এই নদীর জল দুধের মতো ধবল বা স্বচ্ছ বলে এর নামকরণ হয়েছে দুধকুমার।

রূপসা : নড়াইলের ধোনিয়া গ্রামের এক বিশিষ্ট লবণ ব্যবসায়ী রূপচাঁদ সাহার নামেই নদীর নামকরণ করা হয়েছে ‘রূপসা’।
কথিত আছে প্রথমে ভৈরব ও কাজীবাজারের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য খাল খনন করা হয়। প্রাথমিক পর্যায়ে গড়া রূপচাঁদ সাহার খাল পরবর্তীতে রূপসা নদীতে পরিবর্তিত হয়।

ধলেশ্বরী : এই নদীতে কোনো এক সময় দুকুল উপচে ঢল নামতো। এই ঢলকে ঈশ্বরপ্রদত্ত বলে স্থানীয় লোকজন মনে করতো। সেই ঢল + ঈশ্বর = ঢলেশ্বর হতে ধলেশ্বরী নামের উদ্ভব।

মাথাভাঙ্গা : নদীটির সম্মুখভাগ এক সময় ভাঙ্গা ছিল বলে নাম রাখা হয়েছে মাথাভাঙ্গা। এ নদীর উৎপত্তি ভারতের মুর্শিদাবাদ জেলার জলঙ্গীর নিকট পদ্মা নদী থেকে।

Related Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

4 × four =