ডোমেইন ও হোস্টিং কি? দেশের জনপ্রিয় কিছু হোস্টিং সার্ভিস

ডোমেইন ও হোস্টিং কি

আপনারা প্রায়ই ডোমেইন ও হোস্টিং এর কথা শুনে থাকবেন। অনলাইন জগতে খুবই পরিচিত এ দুটি শব্দ। কিন্তু, আসলেই ডোমেইন ও হোস্টিং কি? কীভাবেই বা কাজ করে এই ডোমেইন এবং হোস্টিং? এ বিষয়গুলো নিয়ে অনেকেরই ভালো ধারণা নেই। আজ এ বিষয়েই আপনাদের সাথে কথা বলবো। 

আমরা ইন্টারনেট ঘাটাঘাটির সময় প্রায়ই ডোমেইন ও হোস্টিং এর কথা দেখি। যাঁরা অনলাইনে উপার্জনমুখী কিছু করতে চান, তাঁরাও এ দুটি টার্মের কথা প্রায়ই শুনে থাকেন। ডোমেইন ও হোস্টিং নিয়ে অনেকের আবছা ধারণা থাকলেও এ দুটির কাজ কী, এদের পার্থক্য কী এসব বিষয় অনেকেই জানেন না। 

আবার, ডোমেইন ও হোস্টিং কী, পার্থক্য ও কাজ কী, ইত্যাদি আরও তথ্য- না জেনে অনেকেই অনলাইনে ক্যারিয়ার শুরু করে দেন। ফলে নিউবিরা কিছুদিন যেতে না যেতেই এমন সব সমস্যার মুখোমুখী হয় যে, সেগুলো থেকে উত্তরণের আর সহজ পথ খোলা থাকে না।

তাই চলুন, দেরী না করে শুরু করা যাক ডোমেইন ও হোস্টিং নিয়ে আমাদের আজকের আর্টিকেল। সেই সাথে বাংলাদেশের স্বনামধন্য এবং ভালো কয়েকটা হোস্টিং প্রোভাইডারের নামও আপনাদের সামনে তুলে ধরবো। আশা করি, এটি পড়ার পর ডোমেইন ও হোস্টিং নিয়ে আপনারা একটা পরিষ্কার ধারণা লাভ করবেন।

ডোমেইন ও হোস্টিং কি?

ধরাবাধা সংজ্ঞা না দিয়ে প্রথমেই কিছু উদাহরণ বা উপমা দিয়ে শুরু করা যাক। 

ধরুন, আপনি একটি দোকান খুলতে চান। ব্যবসায়িক কাজ পরিচালনার জন্য সরকারি কর্তৃপক্ষের নিকট থেকে ট্রেড লাইসেন্স নিতে হবে। ট্রেড লাইসেন্স পাওয়ার পর আপনি যেকোনো বৈধ পণ্য সহজে ক্রয়- বিক্রয় করতে পারবেন, দোকানের ঠিকানাও প্রয়োজনমতো পরিবর্তন করতে পারবেন। ডোমেইন কে তুলনা করুন আপনার ট্রেড লাইসেন্সের সাথে, হোস্টিং কে তুলনা করুন দোকানের অবস্থান বা ঠিকানার সাথে।

ট্রেড লাইসেন্সের মতোই অনলাইনে একটি ব্র্যান্ড নেইম তৈরি করতে ডোমেইন রেজিস্টার করতে হয়। আবার, বাস্তব দোকানের পণ্য সাজিয়ে রাখার স্থানের মতো অনলাইনেও হোস্টিং প্রয়োজন হয়, যেখানে ওয়েবসাইটের উপাদান বা কনটেন্টগুলো স্টোর করা থাকে।

এবার আরেকটা সহজ- সরল উদাহরণ দিই। আপনি যখন মোবাইল ফোনে কারো নম্বর সেইভ করেন, তখন দুটো তথ্যের দরকার হয়। নাম এবং নম্বর এই দুটি তথ্য দিয়েই আপনি নিউ কনটাক্ট সেইভ করেন। আপনার কনটাক্ট লিস্টের সবাইকে আপনি নিশ্চয়ই মোবাইল নম্বর ধরে মনে রাখবেন না। তাদেরকে মনে রাখবেন সেইভ করা নামের উপর ভিত্তি করে। 

ডোমেইন হলো অনেকটা এই নামের মতো, হোস্টিং হলো অনেকটা নম্বরের মতো। সবাই ওয়েবসাইটকে মনে রাখে তাদের নাম বা ডোমেইনের উপর ভিত্তি করে, ওয়েবসাইটের হোস্টিং বা আইপি নম্বর ব্যবহারকারীর মনে রাখার প্রয়োজনও হয় না।

সোজা কথায় বলতে গেলে, একটা ওয়েবসাইটের ইউনিক নেইম হিসেবে ডোমেইন রেজিস্টার করতে হয়, অনেকটা ট্রেড লাইসেন্সের মতো। সেই ওয়েবসাইটের কনটেন্টগুলো স্টোর করার জন্য হোস্টিং ব্যবহার করতে হয়, অনেকটা দোকানের মালামাল রাখার স্থানের মতো। 

ট্রেড লাইসেন্স করার সময় যেমন দোকানের নাম সঠিকভাবে উল্লেখ করা হয়, ডোমেইন কেনার সময়ও নাম সঠিকভাবে রেজিস্টার করতে হয়। একবার রেজিস্টার হয়ে গেলে সেই নাম পরিবর্তন করতে পারবেন না। 

দোকানের মালামাল রাখার অবস্থান, বা এক কথায় দোকানের অবস্থান যেমন ভালো এবং ব্যবসা- উপযোগী স্থানে হতে হয়, হোস্টিং এর ক্ষেত্রেও হোস্টিং এর মান, ব্যান্ডউইথ, RAM ইত্যাদি ওয়েবসাইটের ধরণ অনুযায়ী উপযোগী হতে হয়। প্রয়োজন হলে দোকানের ঠিকানা যেমন পরিবর্তন করা যায়, একইভাবে দরকার হলে হোস্টিংও আপনি পরিবর্তন করতে পারবেন। একটা হোস্টিং ভালো না লাগলে ব্যাক আপ নিয়ে অন্য হোস্টিং এ শিফট করতে পারবেন। 

আশা করি, ডোমেইন ও হোস্টিং কি- এ বিষয়ে পরিষ্কার ধারণা পেয়েছেন।

ডোমেইন ও হোস্টিং কিভাবে কাজ করে?

ট্রেড লাইসেন্স করার জন্য যেমন সরকারি দপ্তর আছে, ডোমেইন রেজিস্টার করার জন্যও আন্তর্জাতিক কর্তৃপক্ষ আছে। তার নাম ICANN বা Internet Corporation for Assigned Names and Numbers । তবে এটি সরাসরি গ্রাহকের কাছে ডোমেইন বিক্রি করে না। 

ডোমেইন বিক্রয়কারী অন্য মিডিয়া বা রেজিস্ট্রার ওয়েবসাইটে আপনি ডোমেইন কিনবেন, তারা ICANN থেকে রেজিস্টার করে নিবে। জনপ্রিয় কয়েকটা ডোমেইন রেজিস্ট্রার হলো: নেইমচিপ, গো- ড্যাডি, সেভ ইত্যাদি। 

দোকানে মালামাল রাখার জন্য যেমন আপনাকে একটা দোকান কিনতে হয় বা ভাড়া নিতে হয়, তেমনি ওয়েবসাইটের কনটেন্ট রাখার জন্য আপনার একটি কম্পিউটার দরকার; যেটা সারাক্ষণ চালু থাকবে। এটি নিশ্চয়ই আমাদের সাধারণ কম্পিউটারের মতো নয়। 

রাত- দিন ২৪ ঘণ্টা চালু থাকবে, সঠিক রক্ষণা- বেক্ষণ হবে, নিরাপত্তা থাকবে এমন একটি কম্পিউটার প্রয়োজন, যেটাকে হোস্টিং বলছি। এই কম্পিউটারের লোকেশন তথা ডাটা সেন্টারের লোকেশন হতে পারে বাংলাদেশে, কিংবা ভারত, এশিয়ার অন্য কোনো দেশ এমনকি আমেরিকা, ব্রিটেন, জার্মানি সহ যে কোনো দেশে। 

বিভিন্ন হোস্টিং প্রোভাইডার বিভিন্ন লোকেশনের হোস্টিং ব্যবহার করে। আপনার ওয়েবসাইটের টার্গেট অডিয়েন্সের লোকেশন অনুযায়ী সবচেয়ে কাছের ডাটা সেন্টারেই আপনার ওয়েবসাইট হোস্ট করবেন। ভালো একটি হোস্টিং প্রোভাইডার থেকে নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য আপনি হোস্টিং কিনে নিতে পারেন।

ডোমেইন রেজিস্টার কোম্পানি আপনাকে একটা ডোমেইন প্যানেল দিবে। তাতে আপনার ডোমেইনের সব কন্ট্রোল থাকবে। হোস্টিং প্রোভাইডারও আপনাকে হোস্টিং এর সব কন্ট্রোল সহ একটা হোস্টিং প্যানেল দিবে, এটাকে আমরা অনেকে সি- প্যানেল হিসেবে চিনি। আপনার হোস্টিং প্রোভাইডার আপনাকে DNS Record হিসেবে ২/৩/৪ (সাধারণত ২) টি Nameserver প্রদান করবে। এই ডি এন এস রেকর্ড আপনার ডোমেইন প্যানেলে গিয়ে সেইভ করতে হবে। তারপর হোস্টিং প্যানেলে এসে সেই ডোমেইনকে যুক্ত করতে হবে। 

ফলে, ডোমেইন প্যানেল উক্ত ডি এন এস রেকর্ড বা নেইমসার্ভারের কারণে বুঝতে পারছে যে, কোন হোস্টিং বা আইপি অ্যাড্রেসে এই ডোমেইনের কনটেন্টগুলো হোস্ট করা আছে। আবার, সেই হোস্টিংয়ে যেহেতু ডোমেইনটি যুক্ত করা আছে, তাই ডোমেইন যখনই সেই হোস্টিংকে পয়েন্ট করবে, হোস্টিং তখনই কনটেন্টগুলো সেই ডোমেইনে দেখিয়ে দিবে। 

এটা আসলে একটা পারস্পরিক বা Mutual কাজ। ডোমেইন প্যানেল থেকৈ হোস্টিংকে নেইমসার্ভার ব্যবহার করে পয়েন্ট করতে হবে। আবার, হোস্টিং প্যানেলেও উক্ত ডোমেইন যুক্ত করতে হবে। তবেই ওয়েবসাইট দর্শকের কাছে পৌঁছাবে। 

বাংলাদেশের জনপ্রিয় কিছু হোস্টিং প্রোভাইডার

বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয় অনেক হোস্টিং প্রোভাইডার আছে। তবে লেনদেনের জটিলতা এড়াতে অনেকেই বাংলাদেশি কোম্পানির খোঁজ করেন। দুঃখজনক হলেও সত্য, বেশিরভাগ বাংলাদেশি কোম্পানি সঠিক ও কারিগরি জ্ঞানসম্পন্ন না হওয়ায় তাদের সার্ভিস খুবই নিম্ন মানের হয়। 

ফলে ক্লায়েন্টরা ক্ষতির সম্মুখীন হয়, প্রায়ই ওয়েবসাইট ডাউন হয়ে যায়, হ্যাক হয়, ম্যালওয়্যার বা ডিডিওএস অ্যাটাক হয় কিংবা আরো নানামুখী ক্ষতি হয়। তাই অনেকেই দেশীয় কোম্পানির উপর ভরসা করতে পারেন না। তবে দেশেও ভালো কোম্পানি আছে। নিম্ন মানে দেশ সয়লাব হওয়ায় মানসম্পন্ন কোম্পানি খুঁজে পাওয়া একটু চ্যালেঞ্জিং।

দীর্ঘদিন সুনামের সাথে সার্ভিস দিয়ে গ্রাহককে সন্তুষ্ট করছে, এমন কয়েকটি দেশীয় হোস্টিং প্রোভাইডারের নাম আপনাদের সুবিধার্থে নিচে দেয়া হলো:

ExonHost

সবচেয়ে জনপ্রিয় দেশীয় কোম্পানিগুলোর মধ্যে একটি ExonHost। ExonHost এ দাম অন্য দেশীয় কোম্পানির তুলনায় একটু বেশি। তবে সার্ভিস কোয়ালিটিও মুগ্ধ করার মতো। ডালাস, লস অ্যাঞ্জেলস, নিউ জার্সি, নিউ ইয়র্ক, জার্মানি, সিঙ্গাপুর, বাংলাদেশ সহ বিভিন্ন দেশে তাদের ডাটা সেন্টার রয়েছে। তারা ৯৯.৯৯ শতাংশ আপ টাইম গ্যারান্টি এবং ২৪/৭ কাস্টমার সাপোর্ট দেয়।

Diana Host

এটিও জনপ্রিয় একটি কোম্পানি। ডোমেইন ও হোস্টিং সেলার হিসেবে অনেকদিন ধরে সুনামের সাথে কাজ করছে। তবে ডায়ানা হোস্টে বিডিআইএক্স, পিএনআর, লিনাক্স, ইউন্ডোজ থেকে শুরু করে হরেক রকমের হোস্টিং সার্ভার পাওয়া যায়। Offer age এর মতো অনেক নামকরা সাইট তাদের কাছ থেকে সার্ভিস নিচ্ছে।

তাদের সাইটে কিছু ফ্রি সার্ভিস রয়েছে। যেমন: Plagiarism checker, Meta tag generator, Robot txt generator, Backlink checker, Word counter, Domain age checker.

PixieBlink

PixieBlink হলো Learning Bangladesh প্ল্যাটফর্মের নতুন একটি স্টার্টআপ। তারা ৯৯.৯৯ শতাংশ আপ টাইম গ্যারান্টি এবং ২৪/৭ কাস্টমার সাপোর্ট দেয়। ৫০০ এমবি থেকে শুরু করে ৫ জিবি পর্যন্ত হোস্টিং প্ল্যান এর কথা উল্লেখ আছে তাদের ওয়েবসাইটে।

SNBD Host

এটি একটি জনপ্রিয় বাংলাদেশি হোস্টিং প্রোভাইডার ও ডোমেইন রেজিস্টার কোম্পানি। এটির বেশিদিন না হলেও হোস্টিংয়ের ক্ষেত্রে ভালো সার্ভিস দিচ্ছে। প্রায় ১৫ টি দেশে তাদের ডাটা সেন্টার রয়েছে। তারা ২৪/৭ অনেক ভালো কাস্টমার সাপোর্ট দিচ্ছে। ফ্রি ওয়েবসাইট চেকআপ সুবিধা অফার করছে তারা।

শেষ কথা

অনেকেই কম টাকার লোভ দেখিয়ে ডোমেইন ও হোস্টিং বিক্রি করেন। তাদের সবার উদ্দেশ্য অসৎ না হলেও, বিরাট একটা অংশ অসৎ উদ্দেশ্যেই এমন অফার দিয়ে থাকে। তাই নতুনদের ক্ষেত্রে অভিজ্ঞদের পরামর্শ নেয়া প্রয়োজন। 

অনলাইনে কাজ করতে গেলেই ডোমেইন ও হোস্টিং কিনতে হয়। কিন্তু, শুরুতেই ভুল করে ফেললে পরবর্তীতে হয়তো সেই ভুল থেকে বেরিয়ে আসা সহজ হয় না। তাই ডোমেইন ও হোস্টিং নিয়ে অভিজ্ঞদের সাথে কথা বলে, সঠিক জ্ঞান অর্জন করে নতুনদের এগিয়ে যাওয়ার পরামর্শ থাকবে।

আজকে এ পর্যন্তই। আজকের আর্টিকেলে ডোমেইন ও হোস্টিং কি, এদের কাজ কী এবং জনপ্রিয় কিছু হোস্টিং প্রোভাইডারের নাম আপনাদের বলেছি। ভালো লাগলে লেখাটি শেয়ার করবেন। কমেন্টে আপনার মতামত জানাতে ভুলবেন না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

4 × four =